মনে করেন যে উচ্চতা তখন চারফুট,বয়স চার দুগুণে আট। কিন্ডারগার্টেন ছেড়ে এলাকার প্রসিদ্ধ হাইস্কুলে ভর্তির মহড়া দিলাম,নানা পুলসিরাত পার হয়ে এডমিশন ও নিলাম। সেই কাক ডাকা ভোরে বাসা থেকে বের হতে হয়,সোয়া ছয়টা। এমন দূরত্ব বাসা থেকে যে রিকশা ভাড়া দেবার সামর্থ্য নেই। কাজে কাজেই বাস,লোকাল বাস ই আমার ভরসা। আট পেরোনো বাচ্চাকে মা প্রথম দিন দেখিয়ে দিলেন কিভাবে রাস্তা পেরোবে ও কোন বাসে উঠতে হবে। মেয়ে বাসের পা-দানি ও ঠিকঠাক নাগাল পায় না। বাসের ভাড়া আটআনা (পঞ্চাশ পয়সা),যেতে আসতে একটাকা লাগে। বৃষ্টি হলে যে স্টপেজে গিয়ে নামি সেখান থেকে রিকশায় যাবার বিলাসিতা করা যায়-দুই টাকা রিকশা ভাড়া। দিনের বরাদ্দ ছিল সর্বোচ্চ পাঁচ টাকা।
যেহেতু বাচ্চা মেয়ে,বাসের পা-দানি নাগাল পায় না বাসের কন্ডাক্টর আংকেলরা পিঠের ব্যাগটা হাতে নিয়ে তারপর বাচ্চা আমাকে কোলে করে বাসে তুলে দিতো।
দীর্ঘ ২৩ বছর লোকাল বাসে যাতায়াত করেছি। সময়ের সাথে কন্ডাক্টর আংকেল অন্য রূপ নিয়েছে,আমরাও নিজেদের রক্ষার নানা কেতাকানুন আবিষ্কার করেছি।
দলবেঁধে যাতায়াত এর পন্থা নিজেরাই বের করে নিয়েছিলাম।
সেই বন্ধুদের সাথে সেদিন কথা হচ্ছিলো বাসে অনিরাপদ যাত্রার বর্তমান চালচিত্র নিয়ে। বন্ধুদের ভাষ্য অনুযায়ী আমাদের কৈশোর তারুণ্যে যৌনতা ভাগাভাগির উপায় ছিল রোমান্টিক সিরিজের বই,একটু কিছুমিছু বর্ণনাওয়ালা পিশাচ কাহিনী,বিদেশী ম্যাগাজিনের পাতা,এরপর একসাথে ভিসিআর ভাড়া করে যার বাসা খালি সে বাসায় এডাল্ট ছবি দেখা পর্যন্ত। এরপর এলো ফ্লপি ডিস্কে স্থির চিত্র,সিডিতে চলমান কাটপিস,ছেলেরা অনেকদিন এক টিকিটে দুই ছবি দেখেছে। তাও এসব সবার জন্য সহজলভ্য ছিল না।
এখন সস্তা ভারী সস্তা এমবি,১০ টাকায় সারাদিন নেট,ব্লুটুথে পঁচা পঁচা কন্টেন্ট একজন থেকে আরেকজনে শেয়ার চলছে। নিম্নবিত্ত ছেলেরা সে ভ্যানড্রাইভার,রিকশা চালক,ল্যাগুনা চালক,ট্রাক বাস চালক যেই হোক খাবার খাওয়ার মতো স্বাচ্ছন্দ্যে পর্নো দেখছে। এ দেখার দীর্ঘ মেয়াদী ফলাফল কোন বাছ বিচার কাজ না করা।
আমি বন্ধুদের বললাম এই এক কারণে এ অবস্থা??
তারা বললো না,ছেলেরা নিপীড়ন চালানোর ক্ষেত্রে এখন না কি সমাজতান্ত্রিক হয়ে গেছে,মানে এই এক ব্যাপারে তারা একদমই শ্রেণীবিভাজন রাখছে না-ধনী,মধ্যবিত্ত,নিম্নবিত্ত,দরিদ্র সব শ্রেণীর নারী-শিশু নির্বিশেষে তারা শুধু ভোগ্যবস্ত,বলপ্রয়োগের সহজ টার্গেট হিসেবে বিবেচনা করছে।
জিজ্ঞেস করেছিলাম কিভাবে এই নিপীড়ন কমানো যায় বাসের ক্ষেত্রে?
বন্ধুরা বলে দোস্ত সব বাসে সিসি ক্যামেরা লাগায়ে দেয়া দরকার,কোন বাসের সিসি ক্যামেরা বন্ধ হওয়া মাত্র যে এলাকার বাস সে এলাকার থানায় এলার্ম বেজে উঠবে।
আমি চুপ করে চোখ গোল করে তাকিয়ে থাকলাম।
আপনাদের আইডিয়া শুনতে এত বড় লিখার অবতারণা,সারা জীবন শুনেছি সন্ধ্যা হলে চুরি ছিনতাই এড়াতে বাসের যাত্রা সবচাইতে নিরাপদ।এখন ধর্ষক ও বাস যেন সমার্থক।
ছবি ঃ আমার প্রবাসী বন্ধুরা,যারা বাসে ঘটা যে কোন অপকর্ম ঠেকাতে সাথে থাকতো এককালে। আমাদের ছিল টিপবাটনের ছুরি,ক্ষুর ও অযুত নিযুত সাহস।
