রবিবারের সকালটা আজকে অন্যরকম-পর্দার বাইরে অনেকদিন পর রোদের খিলখিল হাসি,সাথে তাপমাত্রা প্লাস। কোন দৌড়ঝাঁপ নেই,পূর্ণ ছুটির দিন। অভ্যাসে মোবাইলে টানতেই কেন যেন মনে হলো আম্মু তোমাকে একটা ফোন দেয়া দরকার। নিজের মনে হাসলাম-তুমি এখন ফোনের বাইরে মহাকাশে ঘুরছো আনমনে।
বহুকাল পরে তোমার জন্যে শোক হলো না,মন খারাপ হলো না বরং কেমন যেন একধরনের পালক অনুভব শির শির করে আধখোলা চোখে,কমফোর্টারের নীচে পায়ের তালুতে ছড়িয়ে গেল নিমিষে।
তোমাকে ফোন দিলে কি কথা বলতাম! একদম মামুলি জানো আম্মু-যেমন গতরাতে(১১.১১.২৩-শনিবার) এক বাসায় গিয়েছি দাওয়াত খেতে।কত আইটেম যে করা! আমার দিনের পর দিন নিজের এই নবিশ রান্না,গেরস্থালির দুর্বিষহ ভার চেপে এলো মাথার ভেতর;আমার এই সকালে(১২.১১.২৩) আইঢাই করতে থাকলো পেটের ভেতর তুমি কিভাবে একচল্লিশ বছর এই ক্লান্তিকর দাম্পত্য ও রান্নার মতো ততোধিক চাপের একটা কাজ বয়ে নিয়েছো জানার জন্য।
মুক্তি নেই আলেয়া,না কি গোলাম হোসেন (সিরাজউদদৌলা নাটকের বিখ্যাত ডায়ালগ) এ কথা ভেবে ইন্ডিয়ার অনেক বছর ধরে চলা সারেগামাপা গানের প্রতিযোগীতার ভিডিওতে চোখ চলে গেল। কি গান এরা গায় ঈশ্বর! শুধু শুনতে ইচ্ছে করে। এ নিয়ে এক বড় আপার সাথে কয়েকদিন আগে কথা হচ্ছিলো-ইন্ডিয়ানরা মায়ের পেট থেকে পড়েই যেন সঙ্গীতে নিজেকে সঁপে দেয়। তাদের তো এমন হালাল হারাম বাঁধা নেই-তাদের ধর্মীয় কর্মকান্ডের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সঙ্গীত। ইশ,আম্মু এক একজন কি অদ্ভূত গাইয়ে-আমি শুনতেই থাকি।গান শুনা শুরু করলে আমার দুনিয়া হারিয়ে যায়।আমি সময়ের হিসাব হারাই।বিজয়লক্ষ্মী নামের এক মেয়ের কি কণ্ঠ আম্মু! যেমন প্রাচ্যের সুর তার কণ্ঠে তেমন মুহূর্তে সে পশ্চিমা রক স্টাইলে চড়া স্কেলে চলে যাচ্ছে। বুলেটবি,নিশান্ত,সঙ্গীতা,আব্দুল,সোনিয়া মুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকি এবং বারোজন টপ পার্টিসিপেন্টের ছয় জনই পশ্চিম বাংলার।
তুমি কি বেঁচে থাকলে এই যে এত এত ওয়েব সিরিজ দেখি এখন আমাদের সাথে বসে দেখতে?মনে হয় না। তুমি হিন্দি,ইংলিশ কিছুই তেমন পছন্দ করতে না। আমি ভাতিজা রূপাই এর বদৌলতে নানা ফ্রি সাইট থেকে এখন বিভিন্ন সিরিজ দেখি-যেগুলো নেটফ্লিক্স,আমাজন, জি৫,হৈচৈ এ নেই। সুস্মিতা সেনের ‘আরিয়া’ দেখা শুরু করেছি এটা ডিজনি হটস্টারের-আমি আর রূপাই রীতিমতো হাঁস-ফাঁস এক একটা এপিসোড ৫০ মিনিটের উপরে।বলছে থ্রিলার কিন্তু ৪র্থ এপিসোড তক আমরা কোন থ্রিলার খুঁজে পেলাম না-টেনেটুনে দেখেও।
আমার তেমন কারও সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে না। এমন কোন কাঙ্ক্ষিত মানুষ নেই যার রূপ-রস-বর্ণ-গন্ধ আমার খুব প্রার্থিত।এর চেয়ে তোমার সাথে সকাল সকাল ফোনের অভাবে এই যে চিঠি লিখলাম এটাই ভারমুক্ত হওয়ার সহজ
উপায়।
আজকাল এমন লাগে যে যদি আরও বিশ বছর পরে জন্মাতাম কতই না ভালো হতো! মনে করো অমিয়ভূষণের কোন লেখার কথা মনে পড়েছে ফেসবুকে কারও লেখা পড়ে। নিমিষে গুগল করলেই সে লেখা সামনে। নতুন জেনারেশন জেড কত না কিছু অনায়াসে পেয়ে যাবে। ওরা কেউ আমার মতো বেইলি রোডের সাগর পাবলিশার্সে গিয়ে বই পড়ার জন্য বসে থাকবে না। ওরা পিডিএফ পাবে সবকিছুর,পাবে ই-সংস্করণ,অডিও বুক।
আমাকে তোমার নাতনি জিজ্ঞেস করে কেন আমি এত লিখে যাই। ওকে কি আমি বলে বুঝাতে পারব অমিয়ভূষণের আলাপ-[মানুষ যে জন্মে এটাই তার জন্য এক ট্রমা। জীবনে আমরা একের পর এক হারানোর মুখোমুখি হই, বেদনার মুখোমুখি হই। এই ট্রমার থেকে এসকেপ করার জন্য মানুষ সাহিত্য-কাব্য-কলা ইত্যাদি সৃষ্টি করে থাকে। সাহিত্য কী দেয়? “ব্রহ্মস্বাদ সহোদরম।” ব্রহ্মস্বাদ দেয়। ‘সহোদরম’ অর্থাৎ প্রায় একই রকম। যোগী যখন ধ্যানে মগ্ন হন, তার যখন সমাধি অবস্থা, তখন তার ওরকম হয়। গর্ভস্থ ভ্রুণের মতো অবস্থা। সময় নেই, স্পেস নেই, কিছু টানছে না তাকে, সে ব্রহ্মকে আস্বাদ করছে। সমাধি অবস্থা। ব্রহ্মস্বাদ সহোদরম। সাহিত্যও মানুষকে এই সমাধিস্থ অবস্থায় নিয়ে যায়। ট্রমা থেকে দূরে নিয়ে যায়, বেদনা থেকে দূরে নিয়ে যায়।>এ অংশটুকু স্বকৃত নোমানের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে কোট করলাম]
কখন কিভাবে দিন শুরু হয়ে ঝপ করে শেষ হয়ে যায় টের পাই না। কিছুর হিসাব রাখি না আজকাল। আমার কম্পিউটার মেমোরির মতো মাথা ইদানীং অনেক কিছু আর ইচ্ছে করেই মনে রাখে না।
তোমাকে তো রিল কি জিনিস বুঝানো যাবে না-এটা একধরনের নেশাসম;আজকে একটা রিল দেখেছি ইন্সটাগ্রামে সেখানে কি বলে যাচ্ছে শুনে আমি তব্দা–‘২১২৩ সালে আমরা সবাই এখন যারা বেঁচে মরে যাব।আমরা আমাদের বন্ধু বান্ধব আত্মীয় স্বজনসহ মাটির নীচে কবরে থাকব। রক্ত পানি করে যা বাসা বানিয়েছি সেখানে অচেনা কেউ থাকবে এবং যা যা ব্যবহার করতাম তা অন্য কারও দখলে চলে যাব। যে গাড়ি কেনার জন্য শতদিন ধরে টাকা জমিয়েছি তাও ছুঁড়ে দিতে হবে ভাগাড়ে,কিছুই আমাদের কাছে থাকবে না,অনেক কিছু ধ্বংসও হয়ে যাবে। আমাদের উত্তরসূরীরা কেউ আমাদের মনে রাখবে না,বেশিরভাগ জানবেও না আমরা কে কি ছিলাম। যেমন আমি আমার দাদার বাবার নাম জানি না তেমনি আমার বাচ্চার বাচ্চা তোমার নাম জানবে না। তুমি কে ছিলে জানবে না। আমরা মৃত হওয়ার পরে কিছু বছর কারও কারও স্মৃতিতে থাকি তারপর কারও না কারও দেয়ালে ছবি হিসেবে ঝুলে যাই। একসময় আমাদের কর্ম,নাম,পরিচয় সবই ধূসর হয়ে মিলিয়ে যায়। আমরা আমাদের দৈনন্দিনের পঁচানব্বই ভাগ উদ্বেগ যেসব জিনিস নিয়ে করি তা যে কত হাস্যকর তা একশ বছর পরে কোথায় আমি এ কথা ভাবলেই বুঝা যায়।’
অদ্ভূত না আম্মু কথা গুলো?তুমি চলে গেছ প্রায় সাত পার হয়ে আট বছর হয়ে যাচ্ছে। তীব্র মন কেমন করা দিন বর্তমানে তৈরী হয় না। এমন নৈর্ব্যক্তিক নির্বিকারত্ব আয়ত্তে চলে এসেছে যে মাঝে মাঝে নিজেকে ভয় পাই। শুধু তোমার নাতনির কিছু হলে একটু বিচলিত হই আর অন্য কোন ব্যাপার সেভাবে আমাকে নাড়া দেয় না।
শুধু মনে হয় যা হবার তা হবেই-এমন জোরজবরদস্তি করে কোন লাভ হবে না।
একেবারে আংটা দিয়ে টানার মতো করে বেলা ১১টায় নিজেকে বিছানা থেকে তুললাম কারণ দীপিতাকে নাশয়া দিতে হবে।
দেখো এই দীর্ঘ আলাপ আমার কে শুনবে?তুমি থাকলেও তোমাকে বলা হতো না। এই ভালো লিখে ফেললাম নিজের জন্য। কেউ পড়লে ভালো,না পড়লেও কোন অনুযোগ নেই।
যাই,কাজ আছে কিছু। কোনদিন এমন করে ফোন করার ইচ্ছা হলে আবার লিখে ফেলব।