কাছাকাছি ক্যামেরার কেরামতি

টবে পানি দেয়া হয়নি, তাড়াহুড়ো করে স্যান্ডেলে পা গলাতে গলাতে তুপার মনে পড়ে। বাইরে বেরোতেই ত্বকে একধরনের জ্বালা ধরে যায়। সকাল মাত্র আটটা। দুপুর বারোটার তাপ সূর্য এখন থেকেই অকৃপণ হাতে ঢালা শুরু করেছেন। গিয়েই আজ কি কি কাজ তা ভাবতে ভাবতে তুপা রিকশার জন্য ইতি উতি চাইতে থাকে। এই সময়টা মনে হয় রিক্শাওয়ালাকে বিয়ে করলে ভালো হতো।

ট্যাঙস, ট্যাঙস, সক্বালবেলাতেই রিক্শাওয়ালার গায়ে কোন জোর নেই। নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে তুপা হাঁফ ছাড়ে। যাক্, সহযাত্রীরা সবাই এখনো আসেনি। ওদের বাহন বলতে একটা ক্যাব, ঢাকা শহরের সেইসব দুর্লভ ক্যাবের একটি, যে হলুদ ক্যাবে এসি চলে। উঠে যে যার সিটে ঘুমিয়ে পড়া। গেট, সেট, এন্ড স্লিপ। ঢাকার যানজটকে ওরা এভাবেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায় অন্তত সকালের সময়টাতে।

নাহ্, মাথা থেকে টবে পানি দেয়ার প্রসঙ্গটা যাচ্ছেই না। নিজের গায়ে পানি দেবার সময় নেই, সেখানে গাছ…

তাহসিনা আপার পায়ের দিকে তাকিয়ে তুপা হেসে উঠেই চুপ করে যায়।

  • আপা আপনি তো বাথরুমের স্যান্ডেল পরে চলে এসেছেন।
    হ্ুঁ, দেখেছি। এখন আর কিছু করার নেই।
    চোখ বন্ধ রেখেই তাহসিনা আপা খুব নির্বিকারভাবে উত্তর দেন। সবাই একবার করে আপার পায়ের দিকে তাকায়। তারপর নিজেদের নিয়ে খুব সংক্ষিপ্ত বাক্য বলে-
  • আমি তো পুরো একটা বোর্ড মেমো লিখেছি। তারপর ”ফড় ুড়ঁ ধিহঃ ঃড় ংধাব রঃ?” অপশন আসার পর “হড়” দিয়েছি, সাভার ব্রাঞ্চের সাথে কথা বলতে বলতে। আমি আইটি চিফ্, এই জিনিস জানাজানি হলে আমার মান ইজ্জত আর কিছু থাকবে? মাহবুব এটুকু বলে আবার ঘুমিয়ে পড়তে উদ্যত হন।
    তুপারা মনের সুখে হাসে।

তাহসিনা আপা হাসতে হাসতেই নিজের আজকের ভুলটাকে মেনে নেন আবার।

  • পরশু ভাত ছাড়া টিফিন বক্স নিয়ে এলাম দেখলেন না! রিপা তাহসিনাকে বলে।

তুপা এখন পর্যন্ত তেমন ভুলো মনের পরিচয় দেয়নি। তাই শুধু হাসতেই থাকে।

আপি, কি সুন্দর জামা পরেছো! কোথা থেকে কিনলে?
তুপা হেসে ফেলে। তুমি গত তিনমাসে কমপক্ষে দুইবার কাশফি এই জামাটা দেখেছো – এ কথাটা বলতে গিয়ে ও বলে না তুপা। ঐ তো নিপুণ থেকে।

কাশফিকে নিয়ে রুটিন কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিতে থাকে তুপা।

আজকে একবার মেইন বিল্ডিং এ যেতে হবে। নতুন আইডি কার্ডটা, ক্রেডিট কার্ড, পিন এগুলো আনতে হবে। কাশফিদের আবার ফ্রেশাস হিসেবে হাফবেলা ট্রেনিং। নাহ্, ফার্স্ট হাফে গিয়েই জিনিসগুলো আনতে হবে। অন্যথায় আর সময় পাওয়া যাবে না। রোজার সময়টাতে কাজের চাপ যেন দ্বিগুণ হয়ে যায় অথচ ওয়ার্কিং আওয়ার যায় কমে।

সাত সকালে এক বোরখাওয়ালী তুপার টেবিলের সামনে। টিস্যু দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে তুপা দেখে ফেলে। ও টেবিলে বসতেই কাশফি মহিলাকে বলে, আপনি এ ব্যাপারে ম্যাডামের সাথে কথা বলুন।

দিনের প্লাস্টিক হাসিটা তুপা মুখে ঝুলিয়ে নেয়। কাস্টমার সার্ভিস যদিও ওর এক্তিয়ারে নয় তবু কেন জানি সবাই ওকেই রেফার করে দেয় যে কোন গ্যাঞ্জামপূর্ণ সিচুয়েশনে। আদতে ও যে একটা ক্যাবলাকান্ত এটা মনে হয় বুঝেই সবাই ওর ঘাড়ে এগুলো ডাম্প করে বলে তুপার মনে হয়।

-জ্বী আপা বলেন কি হয়েছে।
কি হয়েছে মানে? আপনাদের চোরের ব্যাংক সব চুন্নিরা সেজেগুজে বসে আছে। কোন দুঃখে যে এমন একটা জায়গায় টাকা রাখতে গেলাম! আমার সর্বনাশ হয়ে গেল। এই ঈদের সময় আমি কোথায় পাব আবার টাকা!
-আপনি কি শান্ত হয়ে প্লীজ বলবেন কি হয়েছে?
গতকাল রাতে এটিএম থেকে পাঁচ হাজার টাকা তুলেছি। এই যে সেই স্লিপ। আরো পাঁচ হাজার দুইশত টাকা থাকার কথা। এখন ব্যালেন্স দেখাচ্ছে মাত্র দুইশ টাকা। আমার বাকী পাঁচ হাজার টাকা গেল কই! আমার টাকা ফেরত দিতে হবে। না হয় সাজগোজ করে আর আপনাদের ব্যাংক চালাতে দিব না।

তুপা খুব কৌশলে মহিলাকে নিয়ে কনফারেন্স রুমে চলে যায়।

জ্বী আপা আপনি এবার আমাকে প্রথম থেকে ঘটনাটা পরিষ্কার করে বলুন।

-কাল রাত পৌনে বারোটায় আমি এটিএম থেকে ৫০০০ টাকা তুলেছি। এই যে রিসিট, আর এই যে কার্ড। দেখুন ব্যালেন্স দেখাচ্ছে রিসিট এ ৫২০০টাকা। এখন আবার টাকা তুলতে গিয়ে দেখি ব্যালেন্স নেই। টাকা আছে মাত্র ২০০। এই হলো সংক্ষেপে ঘটনা।

আমি তো আপা আপনার একাউন্ট দেখলাম। এটিএম থেকে আরেকবার গতকাল রাতেই ৫০০০টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। আপনি আমাকে একটা দিন সময় দিলে আপনার ব্যাপারটা আমি সমাধান করে দেব। দয়া করে সবার সামনে আর কিছু বলবেন না। এতগুলো কথা একনাগাড়ে বলে তুপা দম নেয়।

  • আচ্ছা আমি আগামীকাল দুপুরের পর আবার আসব।
    তুপা বিরস বদনে মহিলাকে এক্সিট পর্যন্ত দিয়ে আসতে চায় কিন্তু সেই প্লাস্টিক হাসি, আশ্বাসের চিলতে রোদ ঝুলিয়ে রাখতে হয়। নিশ্চিন্তে থাকুন, আবার দেখা হচ্ছে বলে তুপা ধীর পায়ে নিজের টেবিলে ফিরে আসে।

২.
তুপার টেবিলের পাশ দিয়েই ডাইনিং এবং ফ্রেশরুমে যেতে হয় সবাইকে। এসময় যা একটু সবার সাথে চোখাচোখি হবার সুযোগ ঘটে, বা হাসি বিনিময় কখনো কুশলাদি। রুমি যাচ্ছে। তুপা একমনে কাজ করার ভান করে দেখতে পায় চোখের কোণ দিয়ে কাশফির দিকে রুমির চকিতে অন্য দৃষ্টি দেয়াটা। দুজনের চোখে চোখে বিজাতীয় ভাষায় তথ্য বিনিমিয় হয়েছে তুপা বুঝে এবং আবার মনে মনে হাসে।

সেদিনের কাশফি! মুরগীর বাচ্চার মতো বসে ক্যাশে কাঁপছে। প্রথম দিনই ক্যাশ মেলে না একলাখ টাকা। সবাই তো এই মারে তো সেই মারে অবস্থা! কাশফির কান্না। রুমি, মুশফিক যারা একটু ইয়াং তাদের তাচ্ছিল্য, সাহায্য করতে না পারার অক্ষমতা- সেদিনের কথা মনে হলেও তুপার ভয় ভয় লাগে। কি অমানুষিক খাটুনি দিয়ে তুপা রাত ১২টা পর্যন্ত বসে থেকে কাশফির ক্যাশের গরমিল মিলিয়েছে!

তারপর তো কাশফিকে তুপা ক্যাশ থেকে ওর কাছেই নিয়ে এলো ম্যানেজার ইমতিয়াজ ভাইকে বলে কয়ে। সেই কাশফি এখন চার হাত পায়ে কাজে ফাঁকি দেয়, রুমিদের সাথে সেঁটে থাকে। তারুণ্যের ধর্ম ভেবে তুপা জিনিসটাকে একরকমের প্রশ্রয়ই দেয়।

হ্যালো তুপাপ্পি, কি অবস্থা আপনার? সক্বাল বেলাতেই নিনজা মাইর খেলেন। কোন হেল্প করতে পারি?
রুমি কথা শেষ করতে তুপা চোখ তুলে, না রে ভাইয়া ঠিক আছে সব, দরকার হলে জানাবো।

৩.
দিনের এখনো অর্ধেকও পার হয়নি, কাজ তো শুরুই করতে পারেনি, তুপা ভাবে না জানি আর কি কি ভেজাল আজ সইতে হবে। এক একটা দিন যেন যুদ্ধক্ষেত্র। প্রতিদিনের জন্য নতুন নতুন অস্ত্র তৈরী করা। চ্যালেঞ্জ আছে ঠিকই কিন্তু চাপও কম নয়। মস্তিষ্কে চাপ, মননে চাপ। তুপাদের সাজগোজটাই কাস্টমাররা দেখে, ওরা ও যে মানুষ, ভুল ত্রূটি নিয়েই যে ওদের ও যে জীবন সেটা খুব কম মানুষই ভাবে।

আপু আমি কিন্তু আর এক ঘণ্টা আছি। জরুরী কিছু থাকলে প্লীজ বলে ফেলেন।
কাশফি বারোটায় বেরিয়ে যাবে।
তুমি টেক্সমার্টের ফিন্যান্সিয়ালস গুলো আপডেট করে, ওদের পজিশনটা লোকমান সাহেবকে ইমেইল করো। আমি একটু মেইন বিল্ডিং এ যাব। কিছু জিনিস কালেক্ট করতে হবে।
-ওকে বস্ ডান।
তুপাদের অফিসের সামনের বিল্ডিং এ ই ওদের হেড অফিস। ১০মিনিটে সব কাজ করে তুপা ফিরে চলে আসে।
তোমাকে দিয়ে আপ্পি কিছুই হবে না। একেবারে গেলা আর এলা!

আরে যুগটা হলো পাবলিক রিলেশনের। তুমি কোন জনসংযোগ করতেই রাজি না। না কোথাও যাও না কাউকে কিছু বলো!

থাক তোমাকে আর পাক্কু গিরি করতে হবে না। আমি তো এমনই এটা সবাই জানে। আমি চাই চুপচাপ জাস্ট কাজ করে চলে যেতে। আমার মানুষের সাথে কথা বলতে একদম ভালো লাগে না।

-আপ্পি হতে চাও কথাশিল্পী আর বলো কথা বলতে ভালো লাগে না! তোমার ভবিষ্যত একেবারেই ঝরঝরা।

একটা জিনিস কাশফি এই অল্প বয়সে খুব ভালো করে জেনে গেছে উপরে উঠতে হলে কৌশলী হবার কোন বিকল্প নেই। তুপার মতো আনস্মার্ট, সবাইকে সাহায্য করার মন মানসিকতা নিয়ে আর যাই হোক উপরে উঠা যাবে না। কাছের জনকে ল্যাঙ না মারলে এখানে জায়গা পাওয়া খুবই দুষ্কর। কাশফি তো জানে তুপার আন্ডারে ভ্যাবলাকান্ত হয়ে পড়ে থাকলে প্রমোশন ও হবে না। এ বছর তুপা পাবে প্রমোশন, সো কাশফি পাওয়ার প্রশ্নই উঠে না। তার উপর জয়েন করেছে মাত্র তিন মাস। কাশফির অতশত ভাবনা নেই। সুযোগ এলে ও কাজে লাগাতে পিছপা হবে না। কাজ করে কিছু হয় না। যতটুকু করবে তার বেশি দেখাতে হবে তাহলে ই উন্নতি নামক ভাগ্যদেবী খুব স্বল্প সময়ে এবং অবশ্যই অল্প আয়াসে করায়ত্ত হবে। তুপার মতো কামলা দিতে কাশফি একদমই রাজি না।

কাশফি জানে এই যে ট্রেনিং হচ্ছে এটাতে ও ফার্স্ট হবে। কোর্স কোর্ডিনেটর ওকে নিজে প্রশ্ন আগেই দিয়ে দিবে। এটাও ও জানে। এই বুড়ো ভামের কচি মেয়েদের প্রতি তীব্র আকর্ষণ, অলরেডি কাশফির জালে সে বাঁধা পড়ে গেছে।

তাহেরের ধারণা তার উচ্চতা তাকে নায়কোচিত ভঙ্গীমা দান করেছে। তাহের বেশ লম্বা। পেটের কারণে এখন একটু ভারী হলেও শরীর, তার যতটা বয়স ততোটা,দেখতে মনে হয় না। ছিল একটা যা খুশি তাই কোম্পানীর মানব সম্পদ উন্নয়ন কর্মী। তারপর তো কৌশলে এক বড়লোকের মেয়েকে বিয়ে। যাই হোক শ্বশুরের করা প্রতিষ্ঠানে বসতে তার কোন লজ্জাবোধ নেই। বউ এর বয়স হয়েছে তাহেরেরও এখন রুচি বদলের সময়। আর আজকালকার মেয়েগুলো শরীর মন নিয়ে আগের জমানার নায়িকাসুলভ ন্যাকামো করে না।

ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা পুরুষকে নারী পুরুষ নির্বিশেষেই পছন্দ করে। প্রতি ব্যাচেই চাকুরীর সময় এরকম দু’একটা প্রজাপতি তাহের পায়। অবশ্য মানুষ বুঝে সে চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছায়। বাকীদের সাথে রেস্টুরেন্ট আর ওড়না সরে গলে বুক দেখা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ রাখে। তাহেরের মনে হয় বাংলাদেশে মেয়ের কোন অভাব নেই। প্রথমে বন্ধুত্ব, তারপর মনোভাব বুঝে এগোনো, এই তো, আর কি!

তাহের নিজেই বুঝে না নিজে কি ক্লাস নেয়! এইসব মাস্টার্স করা ছেলে মেয়েগুলো কিভাবে ওকে সহ্য করে এটা ভেবে নিজের মনেই পুলকিত হয়। কোনমতে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ওর জীবনের শুরু, তারপর টাকা দিয়ে ডিগ্রীর সার্টিফিকেট ক্রয়, তার ও বহুবছর পর এক প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি থেকে টাকা দিয়ে এমবিএর সার্টিফিকেট কেনা । ভাগ্যিস ওর নিজের শিক্ষাসনদ কেউ চেক করেনি।
আহ্, এসেছে এ ব্যাচের রূপকুমারী। মাশাল্লাহ, আল্লাহ এই বয়সেই যে সম্পদ কাশফিকে দিয়েছে। মাইয়া জামা কাপড়ও পরে সেরকম। বুক ঠেলে বেরিয়ে আসা, গা কামড়ানো সালোয়ার, ঠোঁটে সেইরকম রং। তাহের মনে মনে বলে, ওগো মেয়ে তোমাকে এই ট্রেনিং এ ফার্স্ট হওয়া কেউ রুখতে পারবে না। তুমি শুধু নিজেকে ব্যবহার করা শেখো।

-স্যার, আব্বু কাল ব্যাংকক থেকে এসেছে। এবার দেখেন এনেছে শুধু শার্ট। আমার তো কেউ নেই ভাবলাম আপনার জন্য একটা আনি। স্যার আপনি কিন্তু ”না” বলতে পারবেন না।

না, না কাশফি আমি আপনার কাছ থেকে এটা নিতে পারি না। (তোমার বুক ছাড়া আমি আর কিছুই চাই না)।

  • না, স্যার আপনাকে নিতেই হবে। আমি কিন্তু খুব মন খারাপ করব। কাশফি তার বিখ্যাত অস্ত্র ঠোঁট গোল করে কান্নার ভান করে ফেলে।
    নিতে পারি এক শর্তে। আপনি যদি-
    -স্যার প্লীজ আমাকে আপনি বলবেন না।
    আচ্ছা তুমি যদি আমার সাথে একদিন লাঞ্চ করো।
    -করব স্যার কিন্তু আপনি যা ব্যস্ত থাকেন আমাকে সময় দিতে পারবেন?
    কাশফি চোখ ঘুরিয়ে এমন একটা ভঙ্গী করে যে তাহেরের যা বোঝার তা বোঝা হয়ে যায়।

ক্লাসে যাও। তাহলে ঐ কথা রইলো, রোজা এবং ঈদ শেষে ফার্স্ট ওয়ার্কিং ডে তেই তুমি আমার সাথে লাঞ্চ করছো।

-স্যার, আমি কিন্তু বাসায় গিয়ে রোজা রেখে (ও কোন রোজাই রাখে না) এত ক্লান্ত থাকি যে পড়ার একদম সময় পাই না। আমার স্যার প্রিপারেশন খুব খারাপ। আপনি যদি স্যার একটু সাজেশন করে দিতেন..

ও নিয়ে তুমি ভেবো না। ক্লাস এটেন্ড করো, আমি তোমাকে গাইড করব।

কাশফি নিজের কেরামতিতে আরেকবার নিজের পিঠ চাপড়ায়। ইউনিভার্সিটিতে প্রতি সেমিস্টার ফাইনালের আগে ও মোটামুটি প্রশ্ন টিচারদের কাছে পেত। আল্লাহ রূপ দিয়েছে ব্যবহারের জন্য। ও যত না রূপসী তার চাইতে ওর উপস্থাপন এবং ড্রেসআপ উজবুক গুলোর মাথা ঘুরায় ও জানে। ইউনিভার্সিটিতে থাকতে ওদের ক্লাসের সবচাইতে ভালো ছাত্র দীপনের সাথে ওর সেইরকম হৃদ্যতা ছিল। কখনো কেউ কাউকে প্রপোজ করেনি কিন্তু কাশফির হাবভাবে সবাই জানতো ও দীপনের। ক্লাসের সবচেয়ে সুন্দর এবং বেস্ট ছাত্রীর সাথেও কাশফির বন্ধুত্ব ছিল। এ গোপন কথাটা কেউ জানে না, এ দুজনের সাথেই কাশফি দেহ বিনিময় করতেও পিছপা হয়নি। ভালো রেজাল্ট হয়েছে। ভার্সিটি শেষ কাশফি কাউকেই মনে রাখেনি। এত্ত ইনভলভড হওযার তো কিছু নেই।

হঠাৎ কাশফি শুনতে পায় আজকে যে টিচার এর ক্লাস নেয়ার কথা উনি আসবেন না। তার মা মারা গেছেন। দোনোমোনো করে কাশফি আবার অফিসের দিকে রওনা দেয়। বেচারী তুপা নিশ্চয়ই একা একা হাঁসফাঁস করছে। একটু ব্যাকআপ দিয়ে গেলে ভালোই হবে।

৫.
ওমা কাশফি কি ব্যাপার ক্লাস শেষ?

  • হ্যাঁ আপু টিচারের মা এক্সপায়ারড। তাই ক্লাস হলো না। ভাবলাম তুমি একা একা তাই চলে এলাম।
    সো সুইট অফ ইউ ডিয়ার।
  • তুপা একটু রুমে আসেন তো।
    ইমতিয়াজ ভাই আপনাকে ডাকে আপু, আমি ফোন ধরেছি ভেবেছে আপনি।

জ্বী বস। ঐ যে নতুন ব্রাঞ্চ ওপেনিং নিয়ে এমডি স্যার বসবেন। আপনাকে কমিটিতে রাখা হয়েছে। তিনটায় মিটিং। রেডি হয়ে নিন।

তুপা দীর্ঘশ্বাস চেপে চলে আসে নিজের টেবিলে। এই মিটিং কখন শেষ হবে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। রোজার দিনে তিনটায় মিটিং শুরু মানে, আজ আর বাসায় ফিরে ইফতারি করা লাগবে না। যেতে হবে একা একা।

তুপা দ্রুত হাতে কাশফির কাছে কাজগুলো বুঝিয়ে ছোট্ট পার্সটা যেটাতে ওর কার্ডস টাকা এসব থাকে সেটা নিয়ে ফ্রেশরুমের দিকে যায়। অন্য সময় না দিলেও এমডির কাছে যেতে একটু সাজুগুজু করতেই হয়। তুপা চুল আঁচড়ে মুখে পানি দিয়ে ওড়নার পিনআপ ঠিক করতে করতেই ফ্রেশরমের দরজায় করাঘাত। আপু, তাড়াতাড়ি করো। মিটিং শুরু হবে। ঐ বিল্ডিং থেকে ফোন এসেছে। তুপা ত্রস্ত পায়ে বেরিয়ে ছুট লাগায়।

৬.

এই মিটিং এর তরজমা তুপা করতেও চায় না, ভালো ও লাগে না। আরে বাপ ব্রাঞ্চ ওপেন করবি কর। এত মিটিং এর কি আছে? নিজের উপর বিরক্ত হওয়াও তুপা ছেড়ে দিয়েছে। যেখানে যায় একমাত্র নারী। ওকে মনে হয় অন্য নারী কলিগরা দেখতেও পারে না।

কি হবে সবকিছুতে প্রথম নারী হয়ে? তুপা তো খুব ভালো করে জানে ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরে নারীদের কোনকিছুর প্রধান হওয়া কত দুষ্কর! যে বাসই আসছে সেটাতেই থিকথিকে ভীড়। গরম, বাসায় যাওয়ার তাড়না, প্রচন্ড জ্যাম সর্বোপরী ইফতারির এমন মুখোমুখি সময় মানুষকে রীতিমতো উন্মাদ করে ফেলেছে। তুপা টিকেট কাটার জন্য ব্যাগে হাত দেয়। এদিক ওদিক খুঁজেও ও ওর বড় ব্যাগের ভেতর রাখা ছোট ব্যাগটা খুঁজে পায় না।
তারমানে কোথাও না কোথাও তুপা ব্যাগটা ফেলে এসেছে। কি করা যায় ভাবতে ভাবতেই দেখে রুমি আসছে বাস স্ট্যাান্ডের দিকেই। রুমি, ভাইয়া আমি এক্ষুণি তোমাদের কাউকে ফোন দিতাম। আমি মনে হয় তাড়াহুড়োয় অফিসের ড্রয়ারে আমার ছোট পার্সটা ফেলে এসেছি। এখন তো ভাড়াও নেই ব্যাগে।

-আপ্পি দাঁড়ান আমি টিকেট কাটছি।

তুপা জানালার পাশে বসার জায়গা পেয়ে খুশি হয়। আজকে সারাদিনে এই একটা ভালো জিনিস ঘটলো। যাক্, কাল অফিস গেলে ব্যাগ পাওয়া যাবে। রুমির কাছ থেকে আরো একশ টাকা চেয়ে নেয় তুপা।

সকালে মোলাকাত হওয়া নিনজা ক্লায়েন্টের বিষয়টাতে এখনো হাতই দিতে পারেনি। এর মাঝে এত সব ভেজাল।

এই রোজার মধ্যে কোন জয়পাড়া ব্রাঞ্চের ওপেনিং নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে হবে। রাহাত ঠিক চিল্লাবে। এমনিতেই এত দূরের আসা যাওয়া নিয়ে বেচারা কম ক্ষিপ্ত নয়। তুপা কোন সময়ই আদতে কাউকে দিতে পারে না। না নিজেকে, না পরিবারের কাউকে, বা বন্ধুবান্ধবকে। ও মোটের উপর রাজপথ আর অফিস এ দুটো জাযগাতেই দিন গুজরান করে দিচ্ছে।

সেতারে ধূলো, কবে লাস্ট মিউজিক করেছে ভুলে গেছে। যাক্, আফসোস করে তো লাভ নেই।
ধুর ভেবেছিলো জিলাপি নেবে, এখন মানিব্যাগটাই অন্য জায়গায়।

-এই কাশফি সরি নিশ্চয়ই রেস্ট নিচ্ছ।
না না আপু বলো কি অবস্থা, মিটিং কেমন হলো।
-যেমন হয় বরাবরের মতোই। এমডি আমাকে বেশ থ্রেট মেরেছে, ফাইবার অপটিকস এর কাজটা না কি আমি মনিটর করলে আরো আগে হতো।
তুমি কি আইটির লোক?
-আমি কিছু বলিনি। উনি তো জেনেশুনেই এমন কথা বল্লেন।
তুমি চুপ করে থেকে সবকিছুতে আপু নিজের বিপদ ডেকে আনো।
-আমার কথা বলতে ভালো লাগে না। আমি ফাইট করতে করতে ক্লান্তরে পিচ্চি।
ফোন করলে কেন হঠাৎ?
-আমার ছোট পার্সটা পাচ্ছি না। এত তাড়া করে বেরুলাম। বাসে উঠতে টিকেট কাটব দেখি ব্যাগ ফকফকা। পরে রুমির সাথে দেখা হওয়াতে বাঁচোয়া। তুমি দেখেছো আমার পার্সটা?
না আপ্পি আমি তো দেখিনি।
-দেখি কাল গিয়ে দেখব হয়তো ড্রয়ারে তালা মেরে আমি ই রেখে এসেছি। ঘোড়ার ডিম, নতুন ক্রেডিট কার্ড পিন নাম্বার সহ, ডেবিট কার্ড, আইডি কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স, ৫০০০টাকা সব ঐ ব্যাগে। কেমন লাগে বলো তো!
-আপ্পি আমি একটু মার্কেটে যাব এখন রাখি। তুমি কাল গিয়ে নিশ্চয়ই ব্যাগ পাবে।
ওক্কে কাল দেখা হবে তাহলে।

৭.

আবার সকাল, আবার ছুট।
তুপা ঢুকেই ড্রয়ার খুলে, নাহ ড্রয়ারে ওর পার্সটা নেই। পিয়নদের জিজ্ঞেস করে, ক্লিনারকে। কেউ কিছু বলতে পারে না।
খাইছে, এখন তো কার্ডগুলো ব্লক করতে হবে।
কার্ড ডিভিশনে ফোন করে তুপা।
-ম্যাডাম কার্ড কাল ই তো রিসিভি করলেন। কখন থেকে পাচ্ছেন না। এই ধরেন বিকেল সাড়ে পাঁচটা।
ম্যাডাম আপনার কার্ড দিয়ে ক্যাশ তোলা হয়েছে কাল সাড়ে আটটায় বিশ হাজার টাকা আর পারচেজ করা হয়েছে আঠারো হাজার।
সর্বনাশ।

  • আমি ম্যাডাম এখন কার্ড ব্লক করে দিচ্ছি।
    পারচেজ করলো কিভাবে?
    -ম্যাডাম আপনি ভুলে গেছেন আমাদের ক্রেডিট কার্ডে কোন ছবি থাকে না। আপনার ঘনিষ্ট কেউই নিয়েছে যে আপনার সিগনেচার জানে এবং দিতে পারে।

ঠিক আছে রাব্বি আমি প্রেয়ার দিয়ে দিচ্ছি আপনি কার্ড লক করেন।

এই ঈদের মাসে এমন ঝটকা। তুপার রীতিমতো কান্না পায়।

আগে নিনজার কেসটা সলভ করতে হবে।
ইমতিয়াজ ভাই আমি একটু পরশু দিনের সিসি ক্যামেরার ভিডিও দেখব। আপনি তো জানেন ঐ ভদ্রমহিলার কেসটা।
-আপনি দেখেন তুপা যত খুশি। এই যে আমি চেয়ার সরিয়ে বসলাম। আপনি ভাই আগাথা ক্রিস্টি মানুুষ। ইমতিয়াজ তার স্বভাব সুলভ ’হা, হা” হাসিতে রুম প্রকম্পিত করে তোলেন।

বস, এই যে দেখেন রাত পৌনে বারোটা ভদ্রমহিলা তার হাজব্যান্ডসহ এটিএমে ঢুকেছে। এই যে টাকা তুললো।
-তুপা আপনি দেখেন না প্লীজ। আড়াই ঘণ্টা ধরে কিভাবে ধৈর্য্য নিয়ে এই জিনিসটা আপনি দেখছেন? আপনার ধৈর্য্যরে আমি নিকুচি করি।
বস, প্লীজ দেখেন না। ব্যাপারটা খুবই ইন্টারেস্টিং । এই যে মহিলা তার হাজব্যান্ড সহ টাকা নিয়ে বেরুলো।
এই দেখেন রাত পৌনে একটা। হাজব্যান্ড একা ঢুকেছে। এই যে পাঁচ হাজার টাকা নিলো। তার মানে ওয়াইফের সাথে ঢুকে সে পাসওয়ার্ড দেখে গিয়েছে। তারপর সেটা জায়গা মতো কাজে লাগিয়েছে।

  • এ তো দেখি সেই কেইসের মতো তুপা। নাহ্, আপনাকে সিসি অপারেটর বানাতে হবে। উফ্, ঐদিনের কথা তুপা আমার এখনো মনে পড়ে। রহিম সিকিউরিটিজের এতদিনের বিশ্বস্ত একাউন্ট্যান্ট এমন ঘটনা ঘটাতে পারে আমি কখনো ভাবিনি। আপনি যদি সেদিন ক্যাশ কাউন্টারের ঐ জিনিস না দেখতেন! শালা কত বদ দেখেন জমার স্লিপে চার লাখ লিখে জমা দিয়েছে তিন লাখ। বাব্বা, সেদিন যে অবস্থা! আপনার গোয়েন্দাগিরির জোরে পার পেয়েছি। নিন, ফোন নিন। ভদ্রমহিলাকে হাজব্যান্ডসহ এখনই আসতে বলে দিন।

বস, আমার একটা ব্যক্তিগত বিষয় ছিল।
-আপনি তো এত বছরে কোনদিন পার্সোনাল কোন বিষয় বলেননি। কবির ভাষায় বলতে হয় আমি কান পেতে আছি আপনি নির্দ্বিধায় বলে ফেলুন।
আপনি তো দেখেছেন কাল কেমন দৌড়াতে দৌড়াতে ব্রাঞ্চ থেকে বের হয়েছি। মিটিং শেষে বাস কাউন্টারে গিয়ে দেখি আমার ব্যাগে ছোট পার্সটা নেই, যেটাতে আমার কার্ডস, টাকা এসব থাকে। পরে আরেক কলিগের সাথে দেখা তার কাছ থেকে টাকা নিয়ে আমি বাসায় গিয়েছি। রাতে ভেবেছি আমি ই ড্রয়ারের ভেতর তালা মেরে রেখে গিয়েছি। সকালে এসে চেক করলাম নেই। পিয়ন, ক্লিনার সবাইকে জিজ্ঞেস করলাম। কেউ দেখেনি। ইভেন এমডি স্যারের ঐখানেও খোঁজ করেছি।
আপনি যদি বস একটু ব্যাপারটা দেখতেন। এর মধ্যে বস্ ২০০০০টাকা ক্যাশ তালা হয়েছে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে, আঠারো হাজার টাকা বস্ পারচেজ। ক্রেডিট কার্ডটা কাল এনেছি সাথেই পিন নাম্বারটা ছিল।

-ভেরি স্যাড আপনি রাতে যখন মিটিং নিয়ে রিপোর্ট করলেন আমাকে, তখন বলেননি কেন?

বস আপনাদের ভাই শুনলে দুশ্চিন্তায় ঘুম হারাম করে ফেলবে তাই বাসা থেকে আর বলিনি। ভেবেছি অফিসের ড্রয়ারে না পেলে কলিগদের কাছে তো পাবোই।

  • আচ্ছা আমি শর্ট মিটিং ডাকছি আগে মেয়েদের ডাকুন। আপনি তো যাবার আগে ফ্রেশরুমে ছিলেন। আপনাদের ফ্রেশরুম যেহেতু আলাদা তাদের আগে জিজ্ঞেস করি।
    আপনি যা ভালো বুঝেন বস।

আপ্পি, এটা কি হলো? আমি তো ভেবেছি তোমার ড্রয়ারে নিশ্চয়ই পাবে। আমার খুব খারাপ লাগছে আপ্পি। তুপা কাশফির দিকে তাকায়, আমার কপালটাই খারাপ।
-নিনজা কেসের কি করলে?
একটু পরে আসবে হাজব্যান্ডসহ তখন বুঝবা।

  • ঐ যে এসে গেছে।

আপা কেমন আছেন?
-ভালো।
আপনারা কাইন্ডলি আমার সাথে ম্যানেজার স্যারের রুমে চলুন।

ইমতিয়াজ খুব আগ্রহ নিয়ে মহিলাকে ভিডিওটা দেখায়। মহিলার হাজব্যান্ডের চেহারা ফাঁদে পড়া ইঁদুরের মতো।

-আমরা আপনার নামে কেইস করতে পারি যদি আপনার ওয়াইফ বলেন। এখন আপনারা হাজব্যান্ড ওয়াইফ ঠিক করেন আমাদের করণীয় কি।
ভাই আপনাদের অনেক সময় নষ্ট করেছি, অনেক আজেবাজে কথা বলেছি এই ম্যাডামকে। আমাকে মাফ করে দিন। আমি বাসায় গিয়ে আমার হাজব্যান্ডের সাথে বোঝাপড়া করব।

  • ম্যাডাম আমি কার্ডস থেকে রাব্বি বলছি। আপনি না কি আমাকে খুঁজেছেন?

রাব্বি একটা কাজ করতে পারবেন? কোন জায়গা থেকে ক’টার সময় ক্যাশটা তোলা হয়েছে, আর পারচেজটা কোন পজ থেকে কখন করা হয়েছে এ দুটো জিনিস কি আমাকে আপনি ডিটেনলস দিতে পারবেন?

  • ম্যাডাম কি যে বলেন…এটা কোন ব্যাপার? ম্যাডাম আপনার সাথে আমার আরেকটা গোপন কথা ছিল। এখনই কাউকে কিছু বলবেন না। আপনাকে ভালো জানি তাই বলি।

বলেন অসুবিধা নেই।

  • ম্যাডাম আপনাদের বিল্ডিং এর লিফটে যে ক্যামের বসানো সেটা কি জানেন?
    জানি তো তাতে কি?
  • ম্যাডাম আপনাদের এক নারী কলিগ অফিসেরই আরেক ছেলেকে লিফটে কিস করেছে। সেটা এখন চেয়ারম্যান স্যারের টেবিলে।
    ও মাই গড।
  • ম্যাডাম আপনি এভাবে চিৎকার করলে তো সমস্যা।
    আমি রাখি। আপনার ইনফরমেশন পেয়ে যাবেন এক ঘণ্টার ভেতর।

কি কাশফি কি হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে।

-হ্যাঁ আপু কেমন যেন পেট গুলাচ্ছে।
চলে যাও তাহলে। ইমতিয়াজ ভাইকে বলো তোমার শরীর খারাপ লাগছে।

  • আপনার ঝামেলা হবে না?
    তুমি অসুস্থ শরীর নিয়ে বসে থাকলে কি ঝামেলা কমবে? বাসায় গিয়ে রেস্ট নাও। কাল যেন আসতে পারো সেটা এনসিওর করো।

-থ্যাংকস আপু।

আজ কোন কাজেই তুপার মন বসছে না। ঈদের মাসে আটত্রিশ হাজার টাকা মাইনাসে থাকা তাও ফর নাথিং। তুপা মনে মনে একচোট আল্লাহর সাথে কথা বলে। সারাদিনের রক্ত পানি করা কামাই। কোন অসৎ কামাই নেই, হালাল কামাই। ওর কেন এমনটা হলো?
যন্ত্রের মতো তুপা কাজগুলো করতে থাকে। কারো সাথে কথা বলতেই ভালো লাগছে না।
মানুষ সব যেন ব্যাংকে হামলে পড়েছে।

তুপার হাতে এই মুহূর্তে বাইশটা এলসি, ৬টা লোন ডিসবার্সমেন্ট এবং ৩টা নতুন প্রপোজাল। তুপা মুশফিককে ডাক দেয় হাত লাগানোর জন্য।

রাব্বির ফোনটা তুপাকে আমূল নাড়িয়ে দেয়।
-ম্যাডাম, টাকা তোলা হয়েছে আমাদেরই সিদ্ধেশ্বরী বুথ থেকে। রাত আটটা পঁয়ত্রিশ মিনিটে। পারচেজ মগবাজার আড়ং থেকে। কার্ড পাঞ্চ হয়েছে ৯.৩৬ মিনিটে। আমি ম্যডাম সিদ্ধেশ্বরী বুথের সিসি ক্যামেরার ক্যাসেট আনাচ্ছি। আড়ং এর সাথে যোগাযোগ করতে একটু সময় লাগবে। ম্যাডাম লিফটের ঘটনাটা কিন্তু কাউকে বলবেন না।

আরে আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম। রাব্বি, মেয়েটা আর ছেলেটা কে চিনতে পারা গেছে?

-আবার জিগায়। একদম সেইরকম ক্লিয়ার আপু, সরি ম্যাডাম।
আমাকে আপু বললে কিছু মনে করব না রাব্বি।

৮.

তুপার একটুও অফিস আসতে ইচ্ছে করছিলো না আজ। রাবিবর পীড়াপীড়িতে এসেছে।
সকালের এসাইনমেন্ট আজ সবাই একসাথে প্রোজেক্টরে ভিডিও দেখা।
মনটা আরো খারাপ লাগে তুপার কাশফি আসতে পারবে না জেনে। ওর না কি ভীষণ জ্বর। যাবার সময় একবার দেখে যাবে ভাবে তুপা কাশফিকে।
রাব্বি সব ঠিকঠাক করে প্রোজেক্টর চালিয়ে দেয়। সিদ্ধেশ্বরী বুথ থেকে টাকা হাতে যে বেরিয়ে এলো তাকে দেখে তুপা কেঁদে ফেলে।
-আপু, কাঁদবেন না। আড়ং এর টা দেখুন।
সবাই মাথা নীচু করে ফেলে।
তুপার আদরের কাশফি, সবচাইতে সুবিধা পাওয়া কাশফি এমন কাজ করতে পারলো?

রাব্বি জিনিসপত্র গুটিয়ে তুপার কাছে আসে। আপু, লিফটের সেই মানুষ দুজন আপনার কাশফি আর রুমি। যদিও কিছু হবে না।

কাশফির ভাই না কি বাংলাদেশ ব্যাংকে আছেন, আর রুমি কোন ডিরেক্টরের ভাগ্নে।

৯.
তুপার পরিচিত পৃথিবীটা চমকে চমকে উঠছে বারেবার। না জানলেই ভালো হতো। ও কাশফির জ্বর দেখতে যাবে। আহ্, ওর মনের জ্বর কে দেখবে?

তুপা লোভের রং খুঁজে ভীষণ নীল আকাশটার মাঝে, আর চোখের জলকে বাষ্প হতে দেয়।

কাশফিরা কেন এমন হয়? এ সময়ে কি স্নেহ সহমর্মীতা এগুলো পাপ?
তুপা এমন পাপ বারবার করতে রাজি। মুশফিককে কাশফির চেয়ারে স্থায়ীভাবেই বসায় তুপা।
ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ভেল্কিতে পুলকিত ও হয়।
অনেকদিন পর নিজেকে রিকশার হুড খোলা ঘূর্ণিতে তুপা জিজ্ঞেস করে, বলো তো আকাশের রং কি?
আকাশের রং সিসি ক্যামেরার মতোই প্রতি মূহূর্তে ফোকাস চেঞ্জ করছে।

তুপা পার্সে থাকা পাঁচ হাজার টাকা উৎসর্গ করে মনে মনে। সবকিছু কাশফির ভাই এসে দিয়ে গেছে তুপার হাতে।

বিদায় কাশফি, আমাকে আর কেউ মধুর করে আপ্পি ডাকবে না। আই উইল মিস ইউ।

একটানে চোখ মুছে তুপা লাফ দিয়ে সেই স্টুডেন্ট লাইফের মতো রিকশা থেকে নামে। একজনের ভুলের জন্য তো পুরো জানালা বন্ধ করা যায় না।

বাসার লিফটে না উঠে তুপা রোজা মুখে সিঁড়ি বাইতে থাকে, ও যে কোন জায়গায় এভাবে উঠতে চায় স্টেপ বাই স্টেপ, শর্টকাটে নয়।

COMMENTS (1)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *