জাতিসংঘের বাংলাদেশ সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি পড়লাম। ৩৭৭ পয়েন্ট সম্বলিত ১৪৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি সময় নিয়েই পড়লাম ব্যক্তিগত আগ্রহে। যারা প্রবলভাবে আওয়ামীলীগ বিরোধী এবং বর্তমান সরকারের সমর্থক তাদের উচ্ছ্বাসে মনে হচ্ছিলো, ছয়মাস পর একটি অব্যর্থ অস্ত্র হাতে পাওয়া গেলো। কিন্তু এখন আমি সন্দিহান, পুরোটা আসলে তারা পড়েছেন কিনা?
আমি আমার অবজারভেশনগুলো লিখে রাখি।
১। জাতিসংঘ প্রতিবেদনের জন্য টাইমফ্রেম ধরেছে ১জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট। আন্দোলন শুরু ১৪ জুলাই, সেক্ষেত্রে ১জুলাই থেকে কেনো বুঝিনি। এরকম ঘটনার সামগ্রিক বিশ্লেষনের জন্য আফটারম্যাথ বিবেচনায় নিতে হয়। এখানে আফটারম্যাথের ১০দিন বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। ১৫ আগষ্টের পর কিছু ঘটনা রেফারেন্স হিসেবে আসলেও খুব গুরুত্ব পায়নি।
২। আন্দোলনকারী এবং বর্তমান সরকারের অনেকে প্রায়ই বলছিলেন, বিগত সরকারের হাতে ২০০০+ নিহত হয়েছেন। এই প্রতিবেদন বলছে- সংখ্যাটি ১৪০০। তাও সরকার পতনের পরবর্তী ১০দিন সহ। প্রতিবেদনটির গ্রহনযোগ্যতা বৃদ্ধি পেতো যদি দেখানো হতো- সরকার পতনের আগে কতোজন নিহত, সরকার পতনের পরে কতোজন নিহত? সব মিলিয়ে- নিহতের মধ্যে কতোজন আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে নিহত, কতোজন আন্দোলনকারীদের হাতে নিহত। ৮ আগস্ট দৈনিক প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার পতনের পর দুদিনে নিহতের সংখ্যা ২৩২। জাতিসংঘ প্রতিবেদনে এভাবে শ্রেনীবিভাগ করলে স্বচ্ছতা আরো স্পষ্ট হতো।
৩। পয়েন্ট ২১১ থেকে ২৪২- সম্ভবতঃ এই ৩২টি পয়েন্ট অনেকে এড়িয়ে গেছেন। এই ৩২টি পয়েন্ট কিন্তু উল্লেখ আছে আওয়ামী লীগ, আইনশৃংখলা বাহিনী, বিভিন্ন ধর্মীয় ও নৃতাত্বিক সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী কী ভয়াবহরকম প্রতিশোধমুলক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। পয়েন্ট ২২০- এ আওয়ামী লীগ সমর্থক নারীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার তথ্য রয়েছে। অন্ততঃ একজন নারী দ্বিতীয় দফায় সহিংসতার শিকার হবার সময় ধর্ষিত হয়েছেন। পয়েন্ট ২৪০ এ জাতিসংঘ স্বীকার করেছে- আন্তরিক চেষ্টা থাকা স্বত্বেও তারা এই ভিক্টিমদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেনি। কেনো? জাতিসংঘের মতো কর্তৃপক্ষ কেনো ভিক্টিমদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেনি? তাদের উত্তর হলো- “ Safety concerns and the difficulty of accessing remote areas where victims were unwilling or unable to come forward due to fear “ । বাহ!
৪। ২২২ নম্বর পয়েন্টে জাতিসংঘ তদন্ত দল বলছে- প্রতিশোধমুলক হত্যা বিশেষ করে আওয়ামী লীগ কর্মী ও পুলিশ হত্যার বিষয়ে তারা তাদের নিজদের সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করতে পারেনি। আওয়ামী লীগ তাদের ১৪৪ জন নিহত কর্মীর তালিকা দিলেও তদন্ত দল সশরীরে সেসব যাচাই করতে পারেনি। কেনো পারেনি? কী আটকেছিলো তাদেরকে? নাকি শব্দ ও বাক্যের আড়ালে জাতিসংঘ বুঝিয়ে দিলো তারা স্বাধীন তদন্ত করতে পারেনি?
৫। পয়েন্ট ২৬২ তে লেখা হয়েছে- “Many perpetrators of revenge violence and abuses against distinct religious and indigenous groups apparently continue to enjoy impunity.” প্রতিশোধমুলক সহিংসতা এবং ধর্মীয় ও নৃতাত্বিক জনগোষ্ঠীকে নির্যাতনকারীরা দায়মুক্তি উপভোগ করছে। এখানে তারা বর্তমান সরকারের প্রদত্ত দায়মুক্তির সমালোচনা করে বলেছে- should not be subject to blanket exclusion from arrest or prosecution.
৬। জাতিসংঘ প্রতিবেদন মত প্রকাশ করেছে- বিগত সরকারের বিরুদ্ধে “মানবতা বিরোধী অপরাধ”- এর বিচার হতে পারে যা একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ। বর্তমান সরকার যদি আন্তর্জাতিক মান, নিরপেক্ষতা ইত্যাদি বজায় রাখে তাহলে উক্ত বিষয়ে সহযোগীতা করতে তারা প্রস্তুত।
৭। জাতিসংঘ প্রতিবেদন যে কথাটি বলেনি- তাদের উল্লেখিত পয়েন্ট ২১১ থেকে ২৪২ “ Abuses against members of distinct religious and indigenous groups”- নির্দিষ্ট গ্রুপ টার্গেট করে সংগঠিত এই অপরাধটিও আরেকটি আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে যার নাম “জেনোসাইড”।
কোন পক্ষেরই নিরংকুশ আরাম বোধ করার মতো কিছু এই প্রতিবেদনে আছে বলে আমার মনে হয়নি।